বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ ০৮:০৯:৪১ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
শনিবার, ২৭ আগস্ট, ২০১৬, ১০:০৭:৩৪
Zoom In Zoom Out No icon

আহা! ব্যাচেলর

আহা! ব্যাচেলর

ডেস্ক রিপোর্ট : বাসা ভাড়া মেলেনি কোথাও, হলে সিট পাননি, বাধ্য হয়ে কমলাপুর রেলস্টেশনে থাকেন ঢাকা কলেজের ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ওমর ফারুক। ছবিটি বৃহস্পতিবার গভীর রাতে তোলা। ছবি : নাভিদ ইশতিয়াক তরু

সম্প্রতি একাধিক জঙ্গি হামলার ঘটনায় রাজধানীতে চরম বিপাকে পড়েছেন ব্যাচেলররা। মাথা গোঁজার একটুখানি ঠাঁইয়ের জন্য হন্যে হয়ে নগরীর এমাথা-ওমাথা ঘুরতে হচ্ছে। তবু মিলছে না বাসা। ব্যাচেলর শুনেই মুখের ওপর ‘না’ বলে দিচ্ছেন বাড়িওয়ালারা। কেউ রাজি হলেও চাইছেন দ্বিগুণ-তিন গুণ ভাড়া। যাঁরা আগে থেকে আছেন তাঁদের ভাড়াও রাতারাতি বাড়ানো হয়েছে। মেসবাড়িগুলোও একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ীসহ লাখো ব্যাচেলরের জীবন কাটছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগে

‘গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা এবং কল্যাণপুরে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের পর বাড়িওয়ালা বাসা ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, তুমি যাদের নিয়ে থাকছ, তাদের কতটুকু চেন? তেমন কিছু ঘটে গেলে তুমিও ফাঁসবা আমিও বিপদে পড়ব। তার চেয়ে বাসা ছেড়ে দাও। আমি আর ব্যাচেলরদের কাছে বাসা ভাড়া দেব না। কিন্তু তারপর হঠাৎ বাসা ছাড়ার চাপ কমিয়ে একপর্যায়ে বাড়িওয়ালা বাসা ভাড়া চার হাজার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন।’ কথাগুলো বললেন মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের ৭/২ নম্বর ভবনের নিচতলার ভাড়াটিয়া সালমান ইসলাম।

সালমানের গ্রামের বাড়ি নেত্রকোনায়। রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় তাঁর বসবাস প্রায় ১৫ বছর ধরে। এ এলাকা থেকেই স্কুল-কলেজে পড়েছেন। এখন একটি স্টেশনারি দোকান পরিচালনা করেন। ৭/২ নম্বর ভবনের নিচতলায় তাঁর সঙ্গে থাকেন কয়েকজন শিক্ষার্থী।

তাঁদের মধ্যে মাহমুদুল হাসান এসেছেন কুড়িগ্রাম থেকে, ভর্তি হয়েছেন মোহাম্মদপুর কেন্দ্রীয় কলেজে। তাঁর রুমমেট সুমন দুই মাস আগে এসেছেন ঠাকুরগাঁও থেকে। সদ্য এইচএসসি পাস করা সুমন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আশায় একটি কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছেন। বাড়ি থেকে পরিবারের পাঠানো  টাকায় তাঁদের মাস চলে। এখন বাড়তি বাসা ভাড়ার দায় মেটাতে হচ্ছে গ্রামে থাকা তাঁদের কৃষক অভিভাবকদের। ব্যাচেলর (অবিবাহিত) ভাড়াটিয়াদের কাছে বেশি ভাড়া আদায়ের তথ্য জানা গেল এ এলাকার আরো কয়েকটি বাসায়। এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাড়ি মালিকের বক্তব্য, ‘এ মুহূর্তে ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেওয়া বড় ধরনের ঝুঁকির বিষয়। এ জন্য বাধ্য হয়েই বেশি ভাড়া আদায় করতে হচ্ছে।’

মাহমুদুল হাসান ও সুমন জানালেন, বাড়ি মালিক তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত করতে সদ্য তোলা ছবি, জন্ম নিবন্ধন সনদ এবং তাঁদের অভিভাবকদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি নিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও উত্কণ্ঠার মধ্যে থাকতে হয়। কখন বাড়ি মালিক বাসা ছেড়ে দিতে বলেন—সেই দুশ্চিন্তা তো আছেই, তার সঙ্গে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কাও দূর হয় না। এ পরিস্থিতিতে গ্রামে তাঁদের মা-বাবাকেও উত্কণ্ঠার মধ্যে থাকতে হয়।

রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষার্থী ও ব্যাচেলর কর্মজীবীদের জন্য বাসা ভাড়া পাওয়া দিন দিন ভীষণ কঠিন হয়ে উঠেছে। বাড়ির মালিকদের কাছে তারা অনেকটাই অপাঙেক্তয়। গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলা ও সর্বশেষ  কল্যাণপুরের জাহাজ বিল্ডিংয়ে জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পর এই জঙ্গিদের কাছে যারা বাসা ভাড়া দিয়েছিল তাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। যথাযথ তথ্য না নিয়ে বাড়িভাড়া দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বাড়িওয়ালাদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। ব্যাচেলর বা শিক্ষার্থীদের কাছে বাড়িভাড়া দিতে চাইছে না বাড়িওয়ালারা। বিভিন্ন বাড়িতে থাকা ব্যাচেলর ভাড়াটিয়ারা এলাকার জঙ্গি প্রতিরোধ কমিটি ও পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে।

যোগাযোগ করলে রাজধানীর ভাটারা থানার ডিউটি অফিসার এসআই শবনম সুলতানা গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের থানা এলাকায় ব্যাচেলর ভাড়াটিয়ার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বাড়ি মালিকরা ব্যাচলেরদের কাছে বাসা ভাড়া দিতে রাজি হচ্ছে না।’

মিরপুরের পল্লবীতে ব্যাচেলরদের বাড়িভাড়া দিতে নিরুৎসাহিত করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা। তিনি গত বৃহস্পতিবার রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আমার এলাকার বাড়ি মালিকদের বলেছি, পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে বেশি টাকার লোভে ব্যাচেলরদের কাছে বাসা ভাড়া দেবেন না। এ ছাড়া জঙ্গি প্রতিরোধের জন্য আমার নির্বাচনী এলাকায় ওয়ার্ড, থানা ও মসজিদভিত্তিক কমিটিও কাজ করছে।’

মোহাম্মদপুর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে নিয়মিত নজরদারির সুবিধার্থে এলাকায় কিছু বাড়ি নির্দিষ্ট করে দিয়ে সেসব বাড়িতে ব্যাচেলর ভাড়াটিয়াদের থাকার ব্যবস্থা করার চিন্তা-ভাবনা হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের চিন্তা-ভাবনা সমর্থন করেননি মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যক্ষ এম এ সাত্তার। তিনি সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৩১ নম্বর ওয়ার্ডে জঙ্গি প্রতিরোধ কমিটির সঙ্গে আমার বৈঠক হয়েছে। তাদের বলে দিয়েছি, বাড়িওয়ালাদের ওপর এভাবে চাপ সৃষ্টি করা ঠিক হবে না। ব্যাচেলর বা শিক্ষার্থীদের বাড়িভাড়া দিতে নিষেধ করলে তাদের অনেক রুম খালি থেকে যাবে। বাড়িভাড়া থেকে আয় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হবে। তবে বাড়িওয়ালারা যাতে তাদের ভাড়াটিয়া সম্পর্কে সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও তা যথানিয়মে পুলিশকে সরবরাহ করে, সে ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়া হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকে বলছে, শিক্ষার্থীদের বাসা ভাড়া দেওয়া বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া সঠিক হবে না। এতে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে তা বাধার সৃষ্টি করবে। এই শিক্ষার্থীদের অনেকেই এইচএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে ঢাকায় এসে বিভিন্ন কোচিং সেন্টারে ভর্তি হয়েছে। এ ছাড়া অনেক কর্মজীবী রয়েছে যাদের পক্ষে আর্থিক কারণেই ঢাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে সপরিবারে বসবাস সম্ভব নয়। এ ছাড়া একাকী জীবন যাপনে যারা বাধ্য হয়েছে এবং নিজস্ব কোনো আবাস নেই, তারা বাসা ভাড়া না পেলে কী করবে? 

এ পরিস্থিতি সম্পর্কে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জঙ্গি তৎপরতা রোধে সরকারকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু কোনো নাগরিক যেন তার বসবাসের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হয় সে বিষয়টিও নজরে রাখতে হবে। প্রয়োজনে ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দিতে বাড়ি মালিকদের উৎসাহ দিতে সরকারকে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে। 

বিশিষ্ট নগর বিশেষজ্ঞ ও সেন্টার ফর আরবান স্টাডিজের চেয়ারম্যান প্রফেসর নজরুল ইসলাম এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, জঙ্গি সমস্যা সৃষ্টি হওয়ার আগে নগরীতে ব্যাচেলর বা সিঙ্গেল পারসনদের আবাসন নিয়ে তেমন চিন্তা-ভাবনা করেনি কেউ। রাষ্ট্রের পক্ষে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের কাজ হচ্ছে সব শ্রেণির আবাসন নিয়ে কাজ করা। ১৯৯৩ সালে দেশে প্রথম গৃহায়ণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। ২০০০ সালে এ-সংক্রান্ত আইন সংশোধন করা হয় এবং চলতি বছরের এপ্রিলের শেষ দিকে ওই আইনের আলোকে জাতীয় গৃহায়ণ নীতিমালা অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে এতে দেশের সব নাগরিকের আবাসন নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও ব্যাচেলরদের বিষয়ে তেমন কিছু বলা হয়নি।

রাজধানীতে আবাসন নিয়ে রাষ্ট্রের পক্ষে যারা কাজ করছে, তারা পূর্বাচল, ঝিলমিলের মতো একটার পর একটা আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। উত্তরায় অ্যাপার্টমেন্ট করা হচ্ছে। কিন্তু এসব প্রকল্পে ব্যাচেলরদের জন্য কোনো ব্যবস্থা নেই। বেসরকারি পর্যায়েও একই অবস্থা। ব্যাচেলর বা সিঙ্গেল পারসন যে এই সমাজের একটি বাস্তবতা সেটা কেউই ভাবছে না। পাকিস্তান আমলে গ্রিন রোডে ব্যাচেলরদের জন্য এবং নীলক্ষেতে কর্মজীবী মহিলাদের জন্য আবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আর ভাবনা-চিন্তা হয়নি। এই বাস্তবতায় শিক্ষার্থী ও কর্মজীবীরা নিজেরা ফ্ল্যাট, বাসা ভাড়া নিয়ে নিজেদের আবাসনের ব্যবস্থা করেছে। এখন জঙ্গি তৎপরতার কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী সিঙ্গেল পারসনদের জন্য নগরীতে থাকা বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বস্তিতে এ সমস্যা তেমন নেই।

প্রফেসর নজরুল ইসলাম বলেন, সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়নি যে নগরীতে ব্যাচেলররা থাকতে পারবে না। তাদের পরিচয় নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বাড়িওয়ালারা ব্যাচেলরদের কাছে বাসা ভাড়া দিতে যে উত্কণ্ঠা ও সংশয়ের মধ্যে রয়েছে তা দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দিতে বাড়ি মালিকদের উৎসাহিত করতে হবে। এ জন্য বিশেষ সুবিধা দিতে হবে বাড়িওয়ালাদের। নগরীতে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া হাজার হাজার শিক্ষার্থী নিজেদের চেষ্টায় মেস, বোর্ডিং করে অবস্থান করছে। তারা এ দেশের সম্পদ। কর্মজীবীরাও দেশের সম্পদ। তাদের যারা বাসা ভাড়া দিচ্ছে তারাও রাষ্ট্রকে সহায়তা করছে। জঙ্গি তৎপরতা রোধের জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নগরীতে শিক্ষার্থী ও সিঙ্গেল পারসনদের থাকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে অবশ্যই ভাবতে হবে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ

এ রকম আর ও খবর



বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  .  জাতীয়  .  স্বাস্থ্য  .  দেশ  .  লাইফস্টাইল  .  ফিচার  .  বিচিত্র  .  আন্তর্জাতিক  .  রাজনীতি  .  শিক্ষাঙ্গন  .  খেলাধুলা  .  আইন-অপরাধ  .  বিনোদন  .  অর্থনীতি  .  প্রবাস  .  ধর্ম-দর্শন  .  কৃষি  .  রাজধানী  .  শিরোনাম  .  চাকরি
Publisher :
Copyright@2014.Developed by
Back to Top