বুধবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭ ১১:০৯:০৩ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
সোমবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৭, ০১:১৪:৫০
Zoom In Zoom Out No icon

তরুণদের প্রস্তুত করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা কী আমাদের দেশে আছে?

তরুণদের প্রস্তুত করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা কী আমাদের দেশে আছে?

বিশ্বে বর্তমানে সাড়ে সাতশো কোটির বেশি মানুষের বসবাস। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাই তরুণ, যাদের বয়স পঁচিশ বছরের নিচে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, ভবিষ্যতের পৃথিবী কাদের হাতে। চীনদেশের বিখ্যাত ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান জ্যাকমা কিছুদিন আগে কানাডাতে এক বক্তৃতায় বলেছেন, ‘তরুণদের উপর বিশ্বাস রাখা মানে ভবিষ্যতের উপর বিশ্বাস রাখা।’ তরুণরাই ভবিষ্যত্ বিনির্মাণের অগ্রপথিক। আজকের তরুণ সমাজ বিজ্ঞানের অনেক যুগান্তকারী আবিষ্কারের সুফল পাচ্ছে। বৈশ্বিক ব্যবসা বাণিজ্যের প্রভাবের কারণে ঘরে বসেই এখন সহজেই সবকিছু হাতের নাগালে পাচ্ছে। একদিকে তারা যেমন এই পৃথিবী থেকে অনেক আধুনিক যুগের সুবিধা নিচ্ছে তেমনি তাদেরও দেওয়ার মতো অনেক দায়বদ্ধতা আছে।

বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বয়সে তরুণ। সারা দেশে তারুণ্যের প্রভাব সহজেই চোখে পড়ে। রাজনীতি থেকে সমাজ পরিবর্তনে তরুণদের অংশগ্রহণ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু সুন্দর ভবিষ্যত্ তৈরি করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের তরুণ সমাজ আসলে কতটা প্রস্তুত? আমরা কি তাদের প্রস্তুত করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করতে পেরেছি? কী হওয়া উচিত আমাদের ভবিষ্যত্ দিক-নির্দেশনা? এসব প্রশ্নের উত্তর পেলে হয়তো কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যাবে।

ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই যে জিনিসটা আসে সেটা হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কী কী বিষয় তরুণদের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, সেটা অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছে। এখনো এদেশের ছেলেমেয়েরা তাদের বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনাকে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অন্যদিকে চাকরি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলিও একইরকম বিষয় বিবেচনা করে। ব্যবসায় শিক্ষা পড়লে খালি ব্যবসা করতে অথবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে হবে আর সামাজিক বিজ্ঞান পড়লে তা করা যাবে না—এরকম  চিন্তাভাবনার আমূল পরিবর্তন দরকার। চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে না ঘুরে নিজেই উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা নিজের এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে।

উন্নত দেশগুলিতে নতুন কিছু নিয়ে কাজ করার জন্য ‘ধারণার কেন্দ্রস্থল’ নামে জায়গা তৈরি করা হয়, যেখানে যে কেউ কাজ করতে পারে। ছাত্রদের জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষণের সুযোগ রেখে এগুলোকে সাজানো হয়, যেখানে প্রতিষ্ঠিত কোম্পানির অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকদের দিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করানো হয়। কীভাবে একটি উন্নত দেশ উদ্যোক্তা তৈরি করে সেটার দিকে তাকালে অনেকটা অভিভূত হতে হয়। আমি যদি অস্ট্রেলিয়ান একটি বিশ্ববিদ্যালয় যেমন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই বলি তাহলে সেখানে দেখা যায়—নতুন চিন্তাভাবনা নিয়ে কাজ করার জন্য আলাদা কেন্দ্র আছে। এসব কেন্দ্রে সারাবছর নতুন ‘আইডিয়া’ নিয়ে কাজ করা হয়। ১৫-২০ জন মানুষ এককভাবে অথবা একটা দল তৈরি করার মাধ্যমে নতুন ‘আইডিয়া’ নিয়ে কাজ করে। সেক্ষেত্রে প্রতিটি সেশন এ অভিজ্ঞ লোকদের নিয়ে এসে অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সবশেষে যাদের আইডিয়া বাস্তবে রূপদান করা সম্ভব, তাদের আরো বৃহত্ পরিসরে যাচাই বাছাইয়ের পর কাজ শুরু করার জন্য মূলধনের ব্যবস্থা থেকে শুরু করে একটা ব্যবসা চালু করার পর পর্যন্ত পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। তাছাড়া সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এধরনের আইডিয়া নিয়ে কাজ করার জন্য যেমন উৎসাহ দেখানো হয় তেমনি প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সত্যিকারের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাকে বেছে নেওয়া হয়। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় না, একটি দেশের রাজ্য পর্যায় পর্যন্ত এধরনের সংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে—যার সুফল কেবল দেশ এবং দেশের মানুষ পাচ্ছে তাই না, সেটা ভৌগোলিক সীমারেখা পার হয়ে সারা বিশ্বে মানুষের কল্যাণে কাজে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক এধরনের কর্মকাণ্ড এখন চীন, ইসরায়েল, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে কার্যক্রম বাড়াচ্ছে। এটা তো শুধু একটা বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বললাম। পূর্ব আফ্রিকার দেশ কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতেও এধরনের ‘আইডিয়া হাব’ নামক কর্মযজ্ঞ দেখা যায়, যেখানে দলবেঁধে তরুণরা নতুন উদ্ভাবনের নেশায় নিজেকে মত্ত রেখেছেন।

বাংলাদেশেও এইধরনের কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে চালু হলে এবং এই বিষয়গুলোকে অধিক গুরুত্ব আরোপের মাধ্যমে আরো গতিশীল করতে পারলে তরুণ সমাজ ভবিষ্যতের জন্য সহজেই নিজেদের তৈরি করার পথ পাবে। চিন্তাভাবনার যে কোনো ক্ষেত্রে যাতে ন্যূনতম প্রশিক্ষণের সুবিধা থাকে এবং সেটা যাতে সহজেই পাওয়া যায়, এধরনের ব্যবস্থা থাকলে যে কেউ উদ্যোক্তা হতে পারবে। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে নিজেকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।  

এটা ডিজিটাল যুগ। বাংলাদেশের মানুষ খুব সহজেই জটিল প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করেছে। ডিজিটাল দক্ষতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা তরুণ প্রজন্মকে অনেক এগিয়ে নিয়ে যাবে। আমাদের তরুণ সমাজের বড় অংশ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন ফেসবুক ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে। বর্তমানে ফেসবুক যেভাবে মানুষের জীবনে বিশেষ করে তরুণদের জীবনে প্রভাব বিস্তার করছে, সেটা বুঝতে পারা জটিল কোনো বিষয় না। কিন্তু কথা হচ্ছে কীভাবে আমরা এই মাধ্যমটিকে কাজে লাগাচ্ছি—সেটাই দেখার বিষয়। আমরা যদি সারাদিনের কথা চিন্তা করি তাহলে দেখা যাবে একটা বড় সময় আমরা ফেসবুকের পিছনে ব্যয় করছি। তাহলে যেখানে আমরা এত সময় দিচ্ছি সেখানে কেন সুযোগ সৃষ্টি করব না? হোক সেটা অনেক ছোট, কিন্তু শুরু করা যেতে পারে সামান্য প্রচেষ্টার মাধ্যমেই। উন্নত দেশগুলোতে এখন ব্যবসার বিজ্ঞাপন থেকে থেকে শুরু করে সম্প্রসারণ পর্যন্ত প্রতিটি কাজে ফেসবুক-এর ব্যবহার অনেক বাড়ছে। অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমন লিংকডইন, টুইটার ইত্যাদির ব্যবহার ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলেছে। ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করার জন্য ছাত্রদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে। আজকাল চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও এধরনের মাধ্যম রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। তাই শুধু ব্যবহার করার জন্যই নয়, কার্যকরভাবে ব্যবহার করার মাধ্যমেই তরুণ সমাজ সামাজিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সুফল নিতে পারবে। এখন কথা হচ্ছে কার্যকরভাবে এসব মাধ্যম ব্যবহার করার জন্য আমাদের সঠিক শিক্ষার প্রয়োজন। সে জন্য আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতির দরকার। সরকারি এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে। আমাদের মনে রাখতে হবে ডিজিটাল শিক্ষার হার যত বাড়বে তরুণসমাজ ততই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কাজগুলোও অনেক জটিল হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য প্রতিটি কাজে সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ভবিষ্যতে আমাদের জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য সরল উদ্ভাবন অনেক কাজে আসবে। এজন্য তরুণদের এখনই প্রস্তুত করতে হবে।

ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা হবে অনেক তীব্র। সঠিক মেধা যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন নতুন বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এখন হয়ত চাকরির সাক্ষাত্কারে সাধারণ প্রশ্ন করা হয়, কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে জটিল সমস্যা সমাধান, সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা, উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার দক্ষতা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনা করেই কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।

আজকের তরুণরা অনেক সচেতন, চটপটে এবং জটিল সমস্যা সহজেই সমাধান করার যোগ্যতা রাখে। তবে তাদেরকে আরো প্রাণবন্ত, সৃজনশীল করতে হলে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ সর্বোপরি রাষ্ট্রকে পালন করতে হবে অগ্রণী ভূমিকা। শুধু সংখ্যা বাড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় না করে কি করে পড়াশোনার মান বাড়ানো যায়, গবেষণায় পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা তৈরি করার মাধ্যমে নতুন অনেক বিষয় আবিষ্কার করা যায়, সমাজ পরিবর্তনে কীভাবে উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগান যায়, ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারে কীভাবে বেশি করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়—সেসব বিষয়ে অধিক গুরুত্ব আরোপ করা যেতে পারে।

এ রকম আর ও খবর



বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি  .  জাতীয়  .  স্বাস্থ্য  .  দেশ  .  লাইফস্টাইল  .  ফিচার  .  বিচিত্র  .  আন্তর্জাতিক  .  রাজনীতি  .  শিক্ষাঙ্গন  .  খেলাধুলা  .  আইন-অপরাধ  .  বিনোদন  .  অর্থনীতি  .  প্রবাস  .  ধর্ম-দর্শন  .  কৃষি  .  রাজধানী  .  শিরোনাম  .  চাকরি
Publisher :
Copyright@2014.Developed by
Back to Top